সত্যের সন্ধানে আরজ আলী মাতুব্বরের লেখা একটি চিন্তাশীল বই। আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন দার্শনিক, মানবতাবাদী, চিন্তাবিদ এবং লেখক। ধর্ম, জগৎ ও জীবন নিয়ে নানারকম জিজ্ঞাসা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে। নিজের প্রবল ইচ্ছা ও সাধনায় বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন তিনি। অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার সমাজ থেকে বাদ দেওয়া ছিল তাঁর জীবনের একটি ব্রত। দীর্ঘ সাধনার পর সেই চিন্তা ও প্রশ্নেরই একটি রূপ হয়ে ওঠে সত্যের সন্ধানে।
আপনি কি কখনো ধর্ম, জগৎ ও জীবন নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করেছেন? অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার কীভাবে মানুষের জীবনে জড়িয়ে থাকে, তা কি ভেবেছেন? ধর্মীয় কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর খুঁজতে কি আপনারও আগ্রহ হয়? বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের উত্তর পেতে পড়তে পারেন সত্যের সন্ধানে আরজ আলী মাতুব্বরের লেখা বইটি ৷
আরজ আলী মাতুব্বরের জীবন শুরু হয়েছিলো দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার মধ্যে। আনুষ্ঠানিক বিদ্যাশিক্ষা বেশিদূর এগোয়নি। কিন্তু পড়া-লেখা শেখার প্রবল আগ্রহ ছিল তাঁর। কৃষিকাজের ফাঁকে পুঁথি পড়েছেন। পাড়ার ছেলেদের পুরোনো পাঠ্যবই এনে পড়েছেন। বিজ্ঞানের বই ও প্রবন্ধ তাঁকে বেশি আকর্ষণ করতো। পরে লাইব্রেরির বই পড়ে বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেছেন। দিন যেতো মাঠে, রাত যেতো পাঠে। মায়ের মৃত্যুর পর একটি দুঃখজনক ঘটনা তাঁর জীবনের গতিপথ বেঁকে দেয়। সেই ঘটনার পর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণ অভিযানে তিনি দামামা বাজাবেন।
সত্যের সন্ধানে আরজ আলী মাতুব্বর বইটির বিষয়বস্তু
মায়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘ ১৮ বছর সাধনার পর সমাজের ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসকে দর্শনের উত্তাপে গলিয়ে বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রশ্নের আকারে একটি তালিকা তৈরি করছিলেন। সেই প্রশ্নগুলোই পরে ‘সত্যের সন্ধান’ বইয়ের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
তৎকালীন বরিশালের লইয়ার ম্যাজিস্ট্রেট ও তাবলিগ জামাতের আমির এফ. করিম সাহেবের সঙ্গে তাঁর তর্কযুদ্ধের পর তাঁকে ‘কম্যুনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে একটি ফৌজদারি মামলায় সোপর্দ করা হয়। মামলার জবাবদিহিতার উদ্দেশ্যে প্রশ্নগুলোর কিছু ব্যাখ্যা লিখে ‘সত্যের সন্ধান’ নামে জবানবন্দিরূপে কোর্টে দাখিল করেন। সেই পাণ্ডুলিপির বদৌলতে মামলায় দৈহিক নিষ্কৃতি পেলেও মানসিক শাস্তি ভোগ করতে হয় বহু বছর।
তৎকালীন পাকিস্তান তথা মুসলিম লীগ সরকারের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে ‘সত্যের সন্ধান’ প্রকাশ করতে এবং ধর্মীয় সনাতন মতবাদের সমালোচনামূলক অন্য কোনো বই লিখতে নিষেধ করে। সভা-সমিতির বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বমত প্রচার করাও নিষিদ্ধ করা হয়। অগত্যা ১৯৭১ সাল পর্যন্ত কলম-কালাম বন্ধ করে ঘরে বসে থাকতে হয়। এভাবে নষ্ট হয়ে যায় তাঁর কর্মজীবনের অমূল্য ২০টি বছর।
বাংলাদেশে কুখ্যাত পাকিস্তান সরকারের সমাধি হলে ‘সত্যের সন্ধান’ বইখানা প্রকাশিত হয় ১৩৮০ সালে, রচনার ২২ বছর পর। বইটির প্রশ্ন ও চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে ধর্ম, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, বিজ্ঞান, দর্শন, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নানামুখী জিজ্ঞাসা। বইটির মূল উদ্দেশ্য ধর্মের বিরোধিতা নয়; বরং ধর্মের সঙ্গে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার থাকা কাম্য নয়—এই ভাবনা থেকেই তাঁর প্রশ্ন ও অনুসন্ধান।
কারা বইটি পড়তে পারেন?
- দর্শনপ্রেমীরা
- বিজ্ঞানমনস্ক পাঠকেরা
- যুক্তিপ্রবণ পাঠকেরা
- মুক্তচিন্তার পাঠকেরা
- ধর্ম ও দর্শন নিয়ে ভাবেন যারা
